মতামত

ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে জেনে নিই,সচেতন হই।

মোঃ ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ মেহেদীঃ

১৫ মার্চ  আন্তর্জাতিক ভোক্তা অধিকার দিবস। কোনো দোকানে গেলে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে পণ্য বা সেবা বিক্রয় করা ভোক্তা অধিকার-বিরোধী কাজ। শুধু এটিই নয়, খাবার পানীয় বা অন্য কোনো খাবারে বিষাক্ত বা রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা নিষেধ। মিথ্যা বা চাতুর্যপূর্ণ বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাকে নিম্নমানের পণ্য কিনতে উদ্বুদ্ধ করা, দাম অনুযায়ী মান বা সেবা প্রদান না করা, ওজনে বা পরিমাপে কম দেওয়া বা এ সংক্রান্ত কোনো জালিয়াতি করা, নকল এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ তৈরি বা বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।


এমনকি সরকারি যেসব সেবা আপনাকে দেওয়া হয় যেমন যোগাযোগ, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পয়োনিষ্কাশন—এসব নিয়েও আপনি অভিযোগ করতে পারবেন। খাবার দোকান, আবাসিক হোটেল বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সেবা নিয়েও অভিযোগ থাকলে মামলা করতে পারবেন। একই আইনে এ সংক্রান্ত ভোক্তাবিরোধী কাজের জন্য এক বছর থেকে তিন বছর এবং ৫০ হাজার টাকা থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার ব্যবস্থা রাখা আছে।
পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন আছে। আমাদের দেশেও আইন রয়েছে। আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো- ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন, ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজ প্রতিরোধ, ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনজনিত অভিযোগ নিস্পত্তি, নিরাপদ পণ্য বা সেবা পাওয়া ব্যবস্থা, কোনো পণ্য বা সেবার ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা, পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্রতারণা রোধ এবং ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি। ভোক্তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় উল্লিখিত বিষয়গুলোকে সামনে রেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়াধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার আইন বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং প্রত্যেক জেলার জেলা ম্যাশিষ্ট্রেট দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। 

ভোক্তা শব্দের সঙ্গে আমরা কিছু লোক পরিচিত, কিছু লোক পরিচিত নই। ভোক্তার ইংরেজী শব্দ কনজুমার যার অর্থ ভোগকারী। অর্থাৎ কেউ কোন পণ্য, খাদ্য, পানীয় দ্রব্য বা সেবা প্রদানকারী দ্রব্য গ্রহণ করে অর্থাৎ যারা ভোগ করে তাদেরকে ভোক্তা বলে।
আইনের আওতায় ভোক্তা হলেন তিনিই যিনি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ব্যতীত, সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে বা সম্পূণ্য বাকিতে পণ্য বা সেবা ক্রয় করেন, অথবা কিস্তিতে পণ্য বা সেবা ক্রয় করেন। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ কোনো না কোনোভাবে একজন ভোক্তা। যিনি ব্যবসায়ী বা সরবরাহকারী তিনিও একজন ভোক্তা। ভোক্তাদের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের সুফল এবং বিরোধী কার্যের কুফল সম্পর্কে জানতে হবে। ভোক্তা হিসেবে আমাদের যে অধিকার আছে তা আমরা অনেকেই জানি না। একজন উৎপাদনকারী বা ব্যবসায়ী যেমন যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ লাভ করার অধিকার রাখেন, তেমনি ভোক্তা হিসেবে ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে নেয়ার অধিকার আমাদের আছে।
“ভোক্তা-অধিকার বিরোধী কার্য” অর্থ,-

(ক) কোন আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোন পণ্য, ঔষধ বা সেবা বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা;
(খ) জ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা;
(গ) মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকারক কোন দ্রব্য, কোন খাদ্যপণ্যের সহিত যাহার মিশ্রণ কোন আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হইয়াছে, উক্তরূপ দ্রব্য মিশ্রিত কোন পণ্য বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা;
(ঘ) কোন পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করা;
(ঙ) প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করা;
(চ) কোন পণ্য সরবরাহ বা বিক্রয়ের সময়ে ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনের পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করা;
(ছ) কোন পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহের উদ্দেশ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ওজন পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত বাটখারা বা ওজন পরিমাপক যন্ত্র প্রকৃত ওজন অপেক্ষা অতিরিক্ত ওজন প্রদর্শনকারী হওয়া;
(জ) কোন পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত পরিমাপ অপেক্ষা কম পরিমাপের পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করা;
(ঝ) কোন পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহের উদ্দেশ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দৈর্ঘ্য পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছু প্রকৃত দৈর্ঘ্য অপেক্ষা অধিক দৈর্ঘ্য প্রদর্শনকারী হওয়া;
(ঞ) কোন নকল পণ্য বা ঔষধ প্রস্তুত বা উ‍ৎপাদন করা;
(ট) মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা; বা
(ঠ) সেবা গ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হইতে পারে এমন কোন কার্য করা, যাহা কোন আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হইয়াছে।

বাংলাদেশ সরকারের ভোক্তা সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর দন্ডবিধি
১। সঠিক মোড়ক ব্যবহার না করার দন্ড ঃ মোড়ক ব্যবহার, পণ্যের ওজন, পরিমান, উৎপাদন, ব্যবহারবিধি, বিক্রয় মূল্য, উৎপাদন তারিখ, প্যাকেটজাত করণের তারিখ, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ স্পষ্ট করে লিখতে হইবে। এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
২। মূল্যের তালিকা প্রদর্শন ও সংরক্ষণ না করার দন্ড ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
৩। ধার্যকৃত মূল্যের অধিক মূল্যে বিক্রির দন্ড ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
৪। ক) ভেজাল পণ্য / ঔষধ বিক্রয়ের দন্ড ঃ
খ) খাদ্য পণ্য নিষিদ্ধ দ্রব্যের মিশ্রণের দন্ড ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ৩ বছর কারাদন্ড অথবা ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
৫। অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন / প্রক্রিয়াকরণের দন্ড ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ২ বছর কারাদন্ড অথবা ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
৬। মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা প্রতারিত করার দন্ড ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
৭। প্রতিশ্র“তপণ্য বিক্রয় অথবা সরবরাহ না করার দন্ড ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
৮। ওজনে কারচুপি অথবা ওজন পরিমাপক যন্ত্রে কারচুপি করার দন্ড ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
৯। পরিমাপক ফিতার কারচুপি ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
১০। নকল পণ্য প্রস্তুতি অথবা উৎপাদন করার দন্ড ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
১১। মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য অথবা ঔষধ বিক্রয়ের দন্ড ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
১২। সেবা গ্রহীতার জীবননাশ অথবা নিরাপত্তা বিপন্নকারী কার্য করা ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
১৩। অবহেলা দ্বারা সেবা গ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য, জীবনহানী ইত্যাদি ঘটাইবার দন্ড ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
১৪। অপরাধ পুনঃ সংগঠন দন্ডঃ দ্বিগুন দন্ডে দন্ডিত।
১৫। মিথ্যা অথবা হয়রানীমূলক মামলা দায়েরের দন্ড ঃ এই বিধি লঙ্ঘন করিলে অনুর্ধ্ব ১ বছর কারাদন্ড অথবা ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ টাকা) জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।

অভিযোগের প্রক্রিয়া: ডাকযোগে, ফোন-ফ্যাক্স, ই–মেইল বা সরাসরি অধিদপ্তরের কার্যালয়ে এসে অভিযোগ করা যায়। তবে অভিযোগটি লিখিত হতে হবে। অভিযোগের সঙ্গে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের রসিদ যুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া অভিযোগকারী পূর্ণাঙ্গ নাম, পিতা ও মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স ও ই-মেইল নম্বর (যদি থাকে) এবং পেশা উল্লেখ করতে হবে। ০১৭৭৭ ৭৫৩৬৬৮ নম্বরে ফোন করে এবং https://dncrp.portal.gov.bd এই ওয়েবসাইটে গিয়ে এ–সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া: অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর অভিযোগকরী এবং যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, উভয় পক্ষকে শুনানির জন্য ডাকবেন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এরপর তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি করবেন। নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে ওই কর্মকর্তা সরেজমিনে তদন্ত বা পরীক্ষাগারে পণ্য পরীক্ষার জন্য যেতে পারেন। এভাবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো পণ্য বা সেবা নিয়ে কেউ প্রতারিত হলে তিনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে পারেন। পরে তদন্ত বা শুনানি শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জরিমানা করা হয়। আইন অনুযায়ী জরিমানার টাকার ২৫ শতাংশ পান অভিযোগকারী। বাকি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়।

পৃথিবীতে ভোক্তা অধিকার বহুদূর এগিয়ে গেছে। ১৯৯৪ সালে ইসা লিসবেক নামের এক মার্কিন নারীর শরীরে ম্যাকডোনাল্ডসের ৫০ সেন্টের কফি পড়ে পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে ছয় লাখ ডলার! শুধু স্বাভাবিক তাপমাত্রা থেকে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কফি দেওয়ার অভিযোগে। আমাদের উচিত নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *