যাদের কাছে ঋনী

নক্ষত্রের পতন

মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ্ আল গালিবঃ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা মামলার অন্যতম আইনজীবী, সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী, উচ্চ আদালতে বিডিআর বিদ্রোহ হত্যা মামলা এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ১৯৭১  সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার প্রধান কৌসুলি হিসেবে কাজ করেছেন জনাব মাহবুবে আলম। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এই মানুষটি বিচার প্রশাসনের বিরাট শূণ্যতা সৃষ্টি করে না ফেরে দেশে চলে গেলেন গত ২৭ সেপ্টেম্বর।

সদ্য প্রয়াত  অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ছিলেন দেশের ইতিহাসে সব থেকে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে যাওয়া রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা।  তাঁর এই বিদায় জাতীর জন্য অপূরনীয় ক্ষতি, এই নক্ষত্রের পতনে যে শূণ্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা কখনো পূরন হবার নয়।

জনাব মাহবুবে আলম ১৯৪৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের  মৌছামন্দ্রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ (অনার্স) এবং পরের বছর লোক প্রশাসনে এমএ পাস করেন। এরপর ১৯৭২ সালে তিনি এল.এল.বি সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সংবিধান এবং সংসদীয় গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইসিপিএস) থেকে সাংবিধানিক আইন এবং সংসদীয় প্রতিষ্ঠান এবং পদ্ধতিতে ডিপ্লোমা ডিগ্রী অর্জন করেন।

তিনি  ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে তালিকাভূক্ত হয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন এবং  ১৯৭৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে এবং ১৯৮০ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আইন পেশা পরিচালনার অনুমতি পান। ১৯৯৮ সালে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

২০০৯ সালে দেশের ১৫ তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান এবং আমৃত্যু তিনি স্বীয় পদে বহাল ছিলেন। এর আগে তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মাহবুবে আলম একমাত্র ব্যক্তি যিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি ছিলেন আবার সরকার নিয়োজিত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এছাড়াও তিনি পদাধিকার বলে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেছেন।

২.

সংবিধান সংশোধনী মামলা, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারসহ জনগুরুত্বপূর্ণ মামলায় রাস্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যে মেধা,মনন ও নিরলস পরিশ্রম  করে গেছেন তা সত্যি অবাক করার মতন। তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তি তর্কে অংশগ্রহণ করেছেন দেশের প্রথিতযশা সব আইনজীবী। আইনী যুক্তি দ্বারায় সব তর্কের জবাব দিয়েছেন। তার যুক্তিতর্কের অনেক অংশ রায়ের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। তাকে রাত অবধি লাইব্রেরিতে দেখা যেত। এমন কি অসুস্থ অবস্থায় তিনি হাসপাতালে বই পড়েছেন ও বার কাউন্সিলের ভার্চুয়াল মিটিংয়ে যোগ দিয়েছিলেন ।   

একাধারে প্রায় একযুগ অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্বে পালন করে যাওয়া প্রমাণ করে তাঁর সততা, নিষ্ঠা এবং দায়িত্ববোধ যা সকলের জন্য একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত।

বিভিন্ন আদালতে সরকারের হয়ে দশটা, পনেরটা কোন কোন দিন বিশটা মামলায় একই দিনে যুক্তিতর্ক হাজির করেছেন। তাঁর এই নিরলস পরিশ্রম জাতীর জন্য অনুসরণীয়।

তাঁর পেশাদারিত্ব ছিল অসাধারন।মামলা পরিচালনার সময় প্রতিপক্ষের প্রতি ছিল ক্ষুরধার যুক্তি। তবে আদালতকক্ষ থেকে  বের হওয়ার পরে  প্রতিপক্ষের সঙ্গে খোশগল্প ও হাসি-তামাশায় মেতে উঠে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতেন যে কয়েক মুহূর্ত আগে আদালতকক্ষে বিতর্কের কঠিন ঝড় উঠেছিল, তা ভাবাই যেত না। পেশাদারিত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন একজন  হিসেবে তিনি আদালত পাড়ায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

তাঁর সময়ের মাঝামাঝিতে বিচার বিভাগ নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক এবং বার ও বেঞ্চের মাঝে নানা দ্বন্দের কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু তাঁর স্বভাবসুলভ বক্তব্যে তা কখনই প্রকাশ পায়নি। বার এবং বেঞ্চের মাঝে তিনি সব সময় সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছিলেন।

এছাড়ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সময় আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের নানামূখী প্রশ্নের সহজ সরল উপায়ে  আইনের জটিল বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন নিয়মিত। এই বিচার প্রক্রিয়ায় আদালত এবং আদালতের বাইরে তাঁর অবদান জাতীকে কলঙ্কমুক্ত করতে অনুস্মনীয় ।

তিনি বার কাউন্সিলের সভাপতি থাকার মেয়াদেই এমসিকিউ পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হয় এবং গুণগত ও মানসম্মত আইনজীবী নিয়োগে তাঁর প্রচেষ্টা ছিল সব সময়।

সমাজের অনেকের ধারনা শুধুমাত্র ব্যারিস্টার না হলে ভাল আইনজীবী হওয়া যায় না। এই ধারনা যে নিছক ভুল এবং মূল্যহীন তার সব থেকে বড় উদাহরণ মাহবুবে আলম। তাঁর কর্মদক্ষতা, সততা, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধ তাঁকে শুধু    একজন আইনজীবী নয় বরং একটি প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছে। তার যুক্তিতর্কের অনেক বিষয় রায়ের অংশ হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। মাহবুবে আলমের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন যে কোন মানুষের জন্য অনুসরনীয় হয়ে থাকবে। ক্ষণজন্মা এই নক্ষত্রের পতনে  লেক্সমিরর পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখকঃ যুগ্ম সম্পাদক, লেক্স মিরর।  ইমেইলঃ ghalibhit@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *