মতামত

ধর্ষনঃ বাংলাদেশ ও ভারত পেক্ষাপটে এই সামাজিক ব্যাধির শেষ কোথায়

মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল গালিবঃ


সম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ধর্ষন এবং যৌন  নির্যাতনের ঘটনা সত্যি জাতির জন্য লজ্জাজনক। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা কি এমন একটা সমাজ তথা দেশ গঠন করতে চেয়েছি! পত্রপত্রিকা, টিভি নিউজ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সব স্থানেই খবরের শিরোনাম হচ্ছে নারী নির্যাতনের খবর। এই সকল ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের ব্যাপারে কঠোর নিন্দা এবং সমালোচনা হলেও, প্রকৃত অর্থে এই নেক্কারজনক ঘটনাগুলোর লাগাম টানা যাচ্ছে না। সভ্য সমাজের জন্য যা অশনিসংকেত। জাতীর অনেক গৌরবময় অর্জনগুলো ফিকে হয়ে যাচ্ছে বৈকি। 

আইন ও সালিস কেন্দ্রের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে আগষ্ট পর্যন্ত ৮৮৯ টি ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪১ জনকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে, ৯ জন নারী করেছেন আত্মহত্যা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে গত আট মাসে ১৯২ টি ধর্ষনের চেষ্টা করা হয়েছে।
কোভিড -১৯ মহামারীর মধ্যেও বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ৪ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এর গবেষনায় একটা ভয়াবহচিত্র ফুটে উঠেছে। তাদের রিপোর্ট বলছে গত বছর (২০১৯ সালে) ১০০৫ টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে যা আগের বছরের তুলনায় ৭৬ শতাংশ বেশি। প্রতিবেদনে দেখা যায় ১৩৩ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে যাদের বয়স ছিল ১ থেকে ৬ বছর।

রিপোর্টেড কেইস যদি এমন হয় তাহলে বাস্তব চিত্র কতটা ভয়াবহ তা অনুমান করা কঠিন নয়।

দুই.

ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের এই চিত্র শুধু আমাদের দেশেই নয়, আমরা যদি আমাদের পাশের দেশ ভারতের দিকে নজর দেই দেখবো সেখানেও ভয়াবহ চিত্র। ভারতের National Crime Records Bureau কর্তৃক গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ এ প্রকাশিত  রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৯ সালে গড়ে প্রতিদিন ৮৭ টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং ৪,০৫,৮৬১ টি নারী নির্যাতনের অভিযোগ এসেছে, যা ছিল গত বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি।

লস অ্যাঞ্জেলেস-ভিত্তিক সংস্থা “ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ” ২০২০ সালের ধর্ষণের সর্বোচ্চ হার সহ ১০ টি দেশ (প্রতি এক লক্ষ নাগরিকের বিপরীতে) তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২০ সালে প্রতি এক লক্ষ নাগরিকের বিপরীতে  ১৩২.৪ টি ধর্ষণের ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে, মোট মামলার সংখ্যা এখানে দাঁড়িয়ে ৬৬১৯৬ টি।
বোট্স্বানায় এই হার ৯২.৯ টি, মোট মামলার সংখ্যা ১,৮৬৫ টি। লেসোথো ২০২০ সালে প্রতি এক লক্ষ নাগরিকের উপর ৮২.৭ টি ধর্ষণ মামলাটি নথিভুক্ত হয়েছে, মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭৭৭ টি।
সুইজারল্যান্ডে প্রতি এক লক্ষ নাগরিকের বিপরীতে ৮২.৭ টি ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে আর এখানে মোট মামলার সংখ্যা ৮৪৯ টি।
বারমুডা, সুইডেন কোস্টারিকা, সুরিনামে এই সংখ্যা প্রতি এক লক্ষ জনের বিপরীতে ৪৫ থেকে ৬২ ‘র ঘরে। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণ হার ২৭. ৩ এবং মোট মামলার সংখ্যা ৮৪৭৬৭ টি।

তিন.

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে ধর্ষন সম্পর্কে  ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) ওয়ালিদ হোসেন বলেছেন, “ধর্ষণকে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা সমস্যা বলা যায় না, এটি একটি সামাজিক সমস্যা।”
তিনি যথার্থই বলেছেন। ধর্ষন, যৌন হয়রানি একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিনত হয়েছে।
করোনার সার্টিফিকেট আনতে গিয়ে ধর্ষন, গাড়ি রোধ করে গৃহবধূকে ধর্ষন, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষন, প্রতিশোধ নিতে গণধর্ষন, শিশু ধর্ষন, শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষন,যানবাহনে ধর্ষন,পুত্র বধুকে ধর্ষন,নাতি কর্তৃক দাদিকে ধর্ষন, নিজের মেয়েকে ধর্ষন সব কিছুই মূল্যবোধহীন দূষিত  সামাজের নির্দেশ করে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে অনেকগুলো ধর্ষনের সাথে ক্ষমতাসীন দলের অনুসারিদের নাম এসেছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহার অবশ্যই লক্ষণীয়। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট এমন যে ধর্ম গুরু, শিক্ষক, বয়োবৃদ্ধ দের দ্বারাও এমন ঘটনা ঘটছে। মনুষ্যবিকৃতির এমন পর্যায়ে আমরা চলে গেছি যে শিশু থেকে ষাটোর্ধ নারীও নিস্তার পাচ্ছে না।

অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় সমাজের এই চিত্রের পেছনে মূলত শ্রেনী বৈষম্য, দুর্বল গণতন্ত্র, আইনের অনুসাশনের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিচার না পাওয়ার সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আইনের অপপ্রয়োগ, অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, দারিদ্র্যতা, মাদকের সহজলভ্যতা, শিক্ষার অভাবসহ নানা বিষয় জড়িত। সাথে সাথে মানুষের মূল্যবোধ, সামাজিকতা অভাব, নৈতিকতার অবক্ষয়, পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদাহীনতা এর পেছনে কাজ করে।
এই কথা যেমন আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য তেমনি তা অন্য দেশ গুলোর জন্যই প্রযোজ্য।

বিশ্বের বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ ভারতের দিকে নজর দিলে আমরা ঠিক একই রকম চিত্র দেখবো। এশিয়ান টাইমস্ পত্রিকার (৩০ সেপ্টেম্বর)  এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাম ও ছোট শহরগুলিতে অপরাধের প্রসার ঘটার কারণ হিসেবে বেকার যুবকদের দুর্বল আইন প্রয়োগ সুযোগ গ্রহণ, পুলিশ বাহিনীতে দুর্নীতি এবং পুলিশের রাজনৈতিককরণের সুযোগ,  রাজনৈতিক প্রভাব বা ঘুষ দিয়ে সাক্ষী কেনার মত কারন গুলো স্পষ্ট।

২০১৭ সালে হাথ্রাসের কয়েকশ কিলোমিটার পূর্বে একজন আইনসভার সদস্য  একটি মেয়ের ধর্ষণ এবং তার বাবার হত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও  প্রকাশ্যে
পালিয়ে যেতে পারেছিলেন  তার রাজনৈতিক ক্ষমতা  কারণেই। যদিও পরে গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রচারের ফলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

Why Men Rape, An Indian Undercover Investigation বইয়ের  লেখক  তারা কৌশাল ধর্ষন বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, সামাজিক শ্রেণি ও বর্ণ, ক্রোধ, ক্ষমতার দাবী, পুরুষতন্ত্র সমাজ ব্যবস্থা এবং নিম্ন আত্মমর্যাদাবোধ যা ধর্ষকের ধর্ষনের মত অপরাধের মানসিকতা সৃষ্টির পেছনে কাজ করে।

পূর্বের প্রজন্মের তুলনায় একটি দ্রুত বিকশিত সমাজ, ছেলে-মেয়েদের বৃহত্তর স্বাধীনতা, যৌন শিক্ষার অভাব, বৈধতাযুক্ত পতিতাবৃত্তিতে নিষেধাজ্ঞা, মাদকের সহজপ্রাপ্যতা, পর্ণগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং মোবাইল ফোনের প্রচলন সামাজিক শৃংখলা ভঙ্গ করার পেছনে বিশেষ ভাবে দায়ি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

চার

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার অ্যাডভোকেট এলিনা খান এর মতে ন্যায়বিচারের অভাবে নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা সহিংসতা হ্রাস পাচ্ছে না।
বাংলাদেশে পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুসারে মাত্র ৩ শতাংশ অপরাধী ধর্ষনের ক্ষেত্রে বিচারের আওয়াত আসে, যা ভারতে ২৭.২ শতাংশ। এটা অবশ্যই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর পেছনে অবশ্যই নানাবিধ কারন রয়েছে। বর্তমানে ১০১টি ট্রাইব্যুনালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধিন দায়েরকৃত প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার মামলার বিচার কার্যক্রম চলমান আছে। উক্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে প্রত্যেকটি ট্রাইব্যুনালে গড় বিচারাধীন মামলার হার প্রায় ১৬৮৩ টি। এছাড়া উক্ত ট্রাইব্যুনালগুলো অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে শিশু আদালতের দায়িত্বে আছে। ১০১টি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই বিপুল সংখ্যক মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।

ভারতের ক্ষেত্রের পেন্ডিং মামলার বোঝাও বিশাল। National Crime Records Bureau (NCRB) হিসাব মমতে ১৫৬৩২৭ টি মামলা ২০১৮ সালে বিচারাধীন ছিল যার মধ্যে ১৭৩১৩ টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। এতে মাত্র ৪৭০৮ জনকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।

পাঁচ.

ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এবং নারী নির্যাতনের এই লাগাম টানতে হবে দ্রুত। এর জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অশিক্ষা, মাদক,বেকারত্ব, প্রভাবমুক্ত  প্রকৃত সাম্যের সমাজ গঠন করা জরুরী। সামাজিকমূল্যবোধ বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ বাড়াতে হবে। আদালতের লজিসটিক সাপোর্ট বৃদ্ধি করা ভিশন জরুরী। এছাড়াও ভিকটিম ও তার পরিবারের সুরক্ষা এবং পাশে দাঁড়ানো দরকার। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি।

মামলা দায়ের করতে যে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সাথে সাথে দ্রুত মামলার তদন্ত এবং সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্তভাবে তদন্তকারী সংস্থাকে কাজ করতে দিতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাবমুক্ত একটা সমাজ গঠন এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়।

নারী অধিকার বিষয়ে সকলকে সচেতন করা এবং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজে সব জায়গায় নারীর মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। নারীর প্রতি মানসিক এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন আনতে না পারলে ধর্ষনের মত সামাজিক ব্যাধির লাগাম টানা যাবে না।

সামাজিক অবক্ষয় রোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ শিক্ষা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে আমাদের আরও বেশি সচেতন হওয়া উচিৎ।

এছাড়াও তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই মন্দ পরিহার ভাল টি গ্রহণ এমন মানসিকতা তৈরী করতে হবে।

বিভিন্ন পর্যায়ে নারী ক্ষমতায়ন ঘটেছে ব্যাপকভাবে কিন্তু পাশাপাশি সামাজের এমন ধর্ষনের চিত্র সত্যি দুঃখজনক।
নারী অধিকার বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রটোকল থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটা ঘটছে তা ভাববার সময় হয়ত এসেছে।


লেখকঃশিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা জজ কোর্ট।
email. ghalibhit@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *